প্রিয় ফরিদপুর.কম

ফরিদপুর জেলার স্মরণীয় ব্যক্তিবর্গ >> বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ

...

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ

  • জন্ম সালঃ ১৯৪৩ সাল
  • জন্ম স্থানঃ ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার সালামতপুর (রউফ নগর)
  • মৃত্যু সালঃ ১৯৭১ সালের ৮ এপ্রিল

মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ। তাঁর বাবা ছিলেন মুন্সি মেহেদী হোসেন ৷ তিনি ছিলেন গ্রামের মসজিদের ইমাম৷ মা মুকিদুন্নেছা ৷ সাক্ষর-জ্ঞান সম্পন্ন স্ত্রী মুকিদুন্নেছা, এক ছেলে মুন্সি আব্দুর রউফ এবং দুই মেয়ে জহুরা ও হাজেরাকে নিয়ে মুন্সি মেহেদী হোসেনের সংসার৷ বাবার কাছেই মুন্সি আব্দুর রউফের লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয়েছিলো ৷

অসম্ভব সাহসী ও মেধাবী রউফের লেখাপড়ার প্রতি মোটেই ঝোঁক ছিলো না ৷ মা একদিন তাঁকে পড়তে বসার জন্য বললেন ৷ কিন্তু ছেলে রউফ পড়তে না বসে গাছের পাখিদের সাথে মিতালিতে ব্যস্ত হয়ে গেল। এই দেখে মা ছেলেকে দিলেন বকা৷ ছেলেও অভিমানে ঘর থেকে বের হয়ে দিলেন দৌড়৷ ছেলে ছুটছে, মা-ও পেছন পেছন ছুটছেন ছেলেকে ধরার জন্য ৷ ছুটতে ছুটতে একেবারে মধুমতি নদীর কিনারে ৷ পাড়ে দাঁড়িয়ে মাকে দৃঢ় স্বরে বললেন, আমাকে ধরতে এলে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ব কিন্তু ৷ মায়ের রক্ত হিম হয়ে এলো৷ ছেলের এই জেদী রূপ মা এর আগে দেখেননি কখনো৷ এরপর মা গলার স্বর নরম করে ছেলেকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাড়ি নিয়ে আসেন৷ আর কোনদিন তাঁকে তিনি বকাঝকা করেননি৷ মুন্সি আব্দুর রউফের বাবা মুন্সি মেহেদী হোসেন হঠাৎ করে মৃত্যুবরণ করেন৷ মুন্সি আব্দুর রউফের বয়স তখন খুবই অল্প ৷ স্বামীর মৃত্যুর পর এক ছেলে আর দুই মেয়ে জহুরা ও হাজেরাকে নিয়ে মা মুকিদুন্নেছা অকূলপাথারে পড়েন৷ নিত্য অভাবের মধ্য দিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি৷ বাধ্য হয়ে অন্যের বাড়ির কাঁথা সেলাই, শিকে তৈরি করার কাজ নেন৷ এমনিভাবে মুকিদুন্নেছা দুঃখের দীর্ঘতম দিনগুলি একটি একটি করে পাড়ি দেন৷ সাথে থাকে ছেলেমেয়েকে বড় মানুষ করার স্বপ্ন ৷ বাবার মৃত্যুর পর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন ঘটতে থাকে আব্দুর রউফের জীবনাচারেও ৷ আস্তে আস্তে কমে যেতে থাকে তাঁর দুরন্তপনা ৷ লেখাপড়ার প্রতি মনযোগ বাড়ে ৷ এর ফলে মেধাবী বলে তাঁর সুনামও হয়৷ গাঁয়ের প্রাথমিক স্কুল শেষ করার পর ভর্তি হন থানা শহরের হাইস্কুলে ৷ এই সময়ে প্রায়ই মায়ের দুঃখ কষ্ট দেখে তিনি বিচলিত হয়ে পড়তেন৷ ভাবতেন কী করে মায়ের কষ্ট লাঘব করা যায় ৷ এতটুকুন ছোট ছেলে কী আর করতে পারেন তিনি? তবে চাচার কাছে শুনেছেন সপ্তম শ্রেণী পাশ করতে পারলে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে পারবেন৷ অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় এলো সেই সুযোগ৷ ১৯৬৩ সালের মে মাসে আব্দুর রউফ যোগ দেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এ ৷ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েও রউফের মন ছিলো বাড়ির দিকে৷ নিয়মিত মাকে টাকা পাঠাতেন এবং চিঠি লিখতেন৷ ছুটি নিয়ে মাঝে মাঝেই বাড়ি চলে আসতেন৷ ১৯৭১ সালে রউফ এক চিঠির উত্তরে মাকে লিখেছিলেন, এখন একটু কাজের ব্যস্ততা বেড়েছে, তাই আগের মতো ঘন ঘন ছুটি পাই না৷ তার জন্য তুমি চিন্তা করো না মা, ছুটি পেলেই বাড়ী আসবো তখন ছোট বোনের বিয়ে দিবো ৷ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে মুন্সি আব্দুর রউফ চট্টগ্রামে ১১ উইং-এ চাকরিরত ছিলেন৷ তিনি ছিলেন মাঝারি মেশিনগান ডিপার্টমেন্টের ১ নং মেশিনগান চালক৷ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হন৷ সেদিন, ৮ এপ্রিল ১৯৭১ ৷ গনগনে মধ্য দুপুরের এক বিশেষ মুহূর্ত৷ সূর্য মাথার উপর থেকে পশ্চিম দিকে হেলে পড়ার জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে৷ নীরব-নির্জন হ্রদের বুক চিরে শান্ত পানিতে অস্থির ঢেউ তুলে এগিয়ে আসতে লাগলো সাতটি স্পিডবোট এবং দুটো লঞ্চ৷ এগুলোর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দুই কোম্পানি সৈন্য ৷ তাদের সঙ্গে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় এবং ভারী অস্ত্রশস্ত্র ৷ এটি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের কোম্পানি৷ লক্ষ্য বুড়িঘাটের মুক্তিবাহিনীর নতুন প্রতিরক্ষা ঘাঁটি ৷ লক্ষ্যের দিকে তীব্রগতিতে ছুটে আসছে দুটি স্পিড বোট এবং দুটি লঞ্চ৷ এগুলোতে রয়েছে ছয়টি তিন ইঞ্চি মর্টার আর অনেক মেশিনগান এবং অনেক রাইফেল৷ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কাছাকাছি পৌঁছেই পাকিস্তান বাহিনী শুরু করলো আক্রমণ ৷ স্পিড বোট থেকে ক্রমাগত চালাতে লাগলো মেশিনগানের গুলি আর লঞ্চ দুটো থেকে ছুটে আসছে অবিরাম তিন ইঞ্চি মর্টারের শেল৷ মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে আসতে লাগলো গুলির পর গুলি৷ গোলাগুলির প্রচণ্ড শব্দে আকাশ বাতাস কেঁপে উঠলো৷ যুদ্ধের এই পর্যায়ে প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কমান্ডার মুন্সি আব্দুর রউফ দেখলেন যে, এভাবে কিছুক্ষণ চলতে থাকলে ঘাঁটির সকলেই মারা পড়বেন৷ তিনি তখন কৌশলগত কারণেই পশ্চাদপসারণের সিদ্ধান্ত নিলেন৷ এই সিদ্ধান্তের কথা সৈন্যদের জানানো মাত্র সৈন্যরা যে যেভাবে পারে পিছু হটতে লাগল৷ মুন্সি আব্দুর রউফ দেখলেন, শত্রু এগিয়ে এসেছে খুব কাছে আর এভাবে সকলে একযোগে পিছু হটতে চাইলে একযোগে সকলেই মারা পড়বে৷ কাভার দেওয়ার জন্যে কাউকে না কাউকে পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে৷ যেই ভাবা সেই কাজ ৷ তিনি পিছু হটলেন না৷ কাভার দেওয়ার জন্য নিজ পরিখায় দাঁড়িয়ে গেলেন মুন্সি আব্দুর রউফ স্বয়ং ৷ অসম্ভব সাহসে, দৃঢ়চিত্তে মেশিনগানটি উঁচুতে তুলে ফেললেন৷ অনবরত গুলি করতে লাগলেন পাকিস্তানি স্পিড বোটগুলোকে লক্ষ্য করে৷ প্রচণ্ড সাহসের সঙ্গেই তিনি কাজে লাগালেন পাকিস্তান রাইফেলসে কাজ করার অভিজ্ঞতা ৷ পাকিস্তানি হানাদারদের তিনি পথ ছেড়ে দিতে রাজি নন৷ শত্রু সেনাদের বিরুদ্ধে একাই লড়তে লাগলেন এই অকুতোভয় বীর ৷ ল্যান্স নায়েক আব্দুর রউফ এক একটা স্পিড বোটকে লক্ষ্য স্থির করে মেশিনগান দিয়ে অবিরাম গুলি বর্ষণ করতে থাকেন৷ তাঁর প্রচণ্ড গুলিবৃষ্টিতে থমকে গেল শত্রুরা৷ তারা প্রত্যাশাও করেনি এমন পাল্টা আক্রমণ হতে পারে৷ রউফের গুলি খেয়ে একের পর এক শত্রুসেনা লুটিয়ে পড়তে লাগলো৷ একটি একটি করে সাতটি স্পিড বোটই ডুবে গেল৷ এমন পর্যায়ে শত্রু সেনারা তাদের দুটি লঞ্চ নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হলো৷ পিছু হটতে হটতে দুটো লঞ্চই চলে গেল রউফের মেশিনগানের গুলির আওতার বাইরে নিরাপদ দুরত্বে৷ হানাদার বাহিনী এবার তাদের লঞ্চ থেকে শুরু করলো মর্টারের গোলা বর্ষণ৷ তারা লক্ষ্য স্থির করল, যেভাবেই হোক থামিয়ে দিতে হবে মুক্তিবাহিনীর মেশিনগানটাকে৷ একের পর এক ক্রমাগত মর্টারের গোলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা রউফের একার পক্ষে সম্ভব ছিলো না৷ শত্রুর একটি মর্টারের গোলা হঠাৎ এসে পড়ে তার বাঙ্কারে৷ মর্টারশেলে ঝাঁঝড়া হয়ে যায় তাঁর সমস্ত শরীর৷ থেমে গেলেন তিনি৷ হাত থেকে পাশে ছিটকে পড়ল মেশিনগান৷ ততক্ষণে তাঁর সহযোগী যোদ্ধারা সবাই পৌঁছে যেতে পেরেছে নিরাপদ দুরত্বে৷ প্রকৃত বন্ধুর মতো একটি মাত্র মেশিনগান দিয়ে একই সঙ্গে শত্রুদের ঘায়েল করলেন এবং সহযোদ্ধাদের রক্ষা করলেন ৷ তিনি বাংলার শোণিতাক্ত সূর্যের সঙ্গে মিশে গেলেন৷ মায়ের বুক খালি হলো, বোনের জন্য বিয়ের শাড়ি নেওয়া হলো না, অথচ নিজের বুকের আলো দিয়ে উজ্জ্বল করলেন তিনি স্বাধীনতার পথ৷ হয়ে গেলেন অমর, বীর, শহীদ, বীরশ্রেষ্ঠ৷ চির রুদ্রের প্রতীক এই বীরকে সমাহিত করা হয়েছিলো রাঙামাটি শহরের রিজার্ভ বাজারে কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারের পাশে৷ ১৯৯৬ সালে রাঙামাটিবাসী প্রথম জানতে পারে, এ চিরসবুজ পাহাড়ের মাঝেই ঘুমিয়ে আছেন বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ৷ ফরিদপুরের এই বীরশ্রেষ্ঠ এঁর নামে তাঁরই গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ স্মৃতি যাদুঘর ও পাঠাগার। তিনি আমাদের ফরিদপুরের অহংকার।

[ ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত, লেখক: মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী]

Last updated at 1 second ago


www.priofaridpur.com


Sunday, 26th May 2024

© www.priofaridpur.com

Our Facebook Group

Email:-priofaridpur@gmail.com

This Application Developed by Visual Art