ফিরে যান

ফরিদপুর জেলার ঐতিহাসিক স্থানসমূহ

নদী গবেষণা ইন্সটিটিউট
13
নদী গবেষণা ইন্সটিটিউট

ফরিদপুর-বরিশাল বিশ্বরোড, হারুকান্দি, ফরিদপুর সদর

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় প্রতিষ্ঠান। নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট দেশের বিভিন্ন পানিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ, নকশা প্রণয়ন এবং ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সরকারকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করে থাকে। এ ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ভৌত নমুনা সমীক্ষাকার্য পরিচালনা (physical model studies), বিভিন্ন মৃত্তিকা পরামিতি (parameters) নির্দেশনা, বিভিন্ন নির্মাণ উপকরণের গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণ, পানির গুণাগুণ বিশ্লেষণ, নদীবাহিত তলদেশীয়, ভাসমান এবং দ্রবীভূত পলল বিশ্লেষণ। নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৭৭ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে এটি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) হাইড্রলিক গবেষণাগার হিসেবে পরিবৃদ্ধি লাভ করে । ১৯৮৯ সালে নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট ঢাকা হতে ফরিদপুর স্থানান্তর করা হয় এবং ১৯৯১ সালের ২০ আগস্ট এ ইনস্টিটিউট এক অধ্যাদেশ বলে (অধ্যাদেশ নং ৫৩, জুলাই ১৯৯০) বিডব্লিউডিবি থেকে পৃথক হয়ে একটি জাতীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ফরিদপুর শহরের উপকণ্ঠে এ প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর অবস্থিত। এখানে একটি রেস্ট হাউজ এবং একটি মিলনায়তন রয়েছে।

ফরিদপুর সুগার মিলস লিমিটেড, মধুখালী
6
ফরিদপুর সুগার মিলস লিমিটেড, মধুখালী

মধুখালী, ফরিদপুর

১৯৭৪ সালে মধুখালী উপজেলার গাজনা ইউনিয়নে ১২৯.৯৭ একর জমির উপর ফরিদপুর সুগার মিলস লিঃ এর কারখানা নির্মাণ করা হয়। কিন্ত পরীক্ষামূলকভাবে চিনি উৎপাদন শুরু করা হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। বানিজ্যিক ভাবে তার পরের বছর অথাৎ ১৯৭৭ সাল থেকে চিনি উৎপাদন শুরু হয়। চিনি উৎপাদনে যে যন্ত্রপাতিগুলো স্থাপন করা হয়েছে তা ষ্টর্ক ওয়ার্কস্পুর, নেদারল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিলো। ফরিদপুর সুগার মিলের বার্ষিক আখ মাড়াই ক্ষমতা ১০১৬০ মে.টন এবং দৈনিক আখ মাড়াই ক্ষমতা ১০১৬ মে.টন। ১৯৭৪ সালে নির্মিত এই খারখানাটি নির্মাণে ৮ কোটি ২৮ লক্ষ টাকা ব্যয় হয়েছিলো। বর্তমানে সরকারি এই কারখানাটি ৩৫০ কোটি টাকার উপরে লোকসানে রয়েছে। মিলটি দীর্ঘদিনের পুরাতন ও জরাজীর্ণ হওয়ায় অধিকাংশ মেশিনারিজের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। তাই পুরাতন যন্ত্রাংশ পরিবর্তন এবং আধুনিক যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন করে আধুনিকায়নের মাধ্যমে মিলের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে মিল কর্তৃপক্ষ মনে করেন।  ফরিদপুর চিনি কলে সরাসরি আখ থেকে চিনি উৎপাদন করা হয় যা স্বাস্থ্যসম্নত ও অধিক পুষ্টি সমৃদ্ধ। বাজারে অন্যান্য চিনির থেকে এ মিলের উৎপাদিত চিনি ভেজাল এবং ক্ষতিকর কেমিক্যাল মুক্ত। এ কারখানাটি পুনরায় লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিনত করার জন্য সরকারি যথাযথ পৃষ্টপোষকতা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। 

পল্লীকবি জসীম উদদীনের বাড়ি
5
পল্লীকবি জসীম উদদীনের বাড়ি

অম্বিকাপুর, ফরিদপুর সদর, ফরিদপুর

ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুর রেলষ্টশনের উত্তরে কুমার নদীর দক্ষিণে গোবিন্দপুর গ্রামে পল্লী কবি জসীম উদদীনের বাড়ী। বাড়ীতে ০৪টি পুরাতন টিনের ঘর চার চালা ঘর রয়েছে। কবির ব্যবহ্নত বিভিন্ন জিনিসপত্রাদি ঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। কবির বিভিন্ন লেখা বাড়ীর চত্ত্বরে প্রদর্শন করা আছে। বাড়ীর পূর্ব ও পশ্চিমে পোর্শিদের বসতবাড়ী এবং দক্ষিণে ছোট একটি পুকুর রয়েছে। বাড়ীর উত্তরে কবির কবর স্থান। কবর স্থানের পাশ্বেই পাকা রাস্তা ও কুমার নদী আছে। কবি ১৪-০৩-১৯৭৬ খ্রিঃ হতে ডালিম গাছের তলে চির নিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। পুরো পারিবারি কবর স্থানটি রাস্তা থেকে উচু এবং পাকা করা, কবরের চতুর্দিকে গ্রীলের বেষ্টুনী রয়েছে। এই কবরে কবি ছাড়াও যারা রয়েছেন তাদের তালিকা নিচে দেওয়া হলো- ১। কবির পিতা- আনছার উদ্দিন মোল্লা ( মৃত্যুঃ ২৬-১১-১৯৪৩) । ২। কবির মাতা- আমেনা খাতুন (রাঙ্গা ছোটু) (মৃত্যুঃ ১৫-১০-১৯৫৩)।  ৩। কবি পত্নী - বেগম মমতাজ জসীম উদ্দিন (মৃত্যুঃ ১৪-০১-২০০৬) ৪। বড় ছেলে - কামাল আনোয়ার (হাসু) ( মৃত্যুঃ ০৩-০৬-১৯৯০ ) ৫। বড় ছেলের স্ত্রী - জরিনা ( মৃত্যুঃ ৩০-০৬-১৯৬৩) ৬। কবির বড় ভাই- আলহাজ্ব মফিজ উদ্দিন মোল্লা (মৃত্যুঃ ১৪-৪-১৯৬৩)। ৭। কবির সেজো ভাই- সাঈদ উদ্দিন আহম্মদ মোল্লা (মৃত্যুঃ ২৪-৩-১৯৭৫)। ৮। কবির ছোট ভাই- প্রফেসর নুুরুদ্দীন আহম্মদ ( মৃত্যুঃ ০১-০৭-১৯৬৪)। ৯। কবির ছোট বোন- নুরুন নাহার (সাজু) ( মৃত্যুঃ ১০-১১-১৯৫০) ১০। কবির নাতিন - আসিফ ( মৃত্যুঃ ৩০-০৩-১৯৮০) ১১। কবির সেজো ভাইয়ের মেয়ে - মোসাঃ হোসনে আরা (দোলন) (মৃত্যুঃ ২৪-৪-১৯৭৩) ১২। কবির সেজো ভাইয়ের নাতনী - মনজুরু শাহরী (চাদনী) ( মৃত্যুঃ ০৮-৬-২০০৭)

পাতরাইল দিঘীরপাড় আউলিয়া মসজিদ, ভাংগা
4
পাতরাইল দিঘীরপাড় আউলিয়া মসজিদ, ভাংগা

পাতরাইল, ভাংগা উপজেলা, ফরিদপুর

ভাঙ্গা উপজেলাধীন আজিমনগর ইউনিয়নের পাতরাইল গ্রামে অবস্থিত প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী আউলিয়া খান জামে মসজিদটি ১৩৯৩ হতে ১৪১০ খ্রিঃ মধ্যে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ নির্মাণ করেন বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে এটি ভাঙ্গা উপজেলাধীন পাতরাইল দীঘিরপাড় আউলিয়া মসজিদ নামে সুপরিচিত। এ ঐতিহাসিক মসজিদের দক্ষিণ পাশ্বেই চির নিন্দ্রায় শাহিত আছেন মহান আউলিয়া মজলিস আউলিয়া খান। মসজিদের আঙ্গিনায় আছে মস্তান দরবেশ নাজিমদ্দিন দেওয়ানের মাজার। আউলিয়া খানের মাজারের দক্ষিণ পাশে আছে ফকির ছলিমদ্দিন দেওয়ানের মাজার। জনশ্রুতি আছে যে, অত্র এলাকায় প্রজাদের পানীয় জলের সমস্যা নিরসনকল্পে ও ইবাদতের জন্য মসজিদের পার্শ্বেই ৩২.১৫ একর জমির উপর একটি দীঘি খনন করেন। মসজিদটি বর্তমানে প্রত্মতত্ত্ব বিভাগের নিয়ন্ত্রনাধীন আছে। মসজিদটি ১০ গম্বুজ বিশিষ্ট। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৮৪ ফুট, প্রস্থ ৪২ ফুট। চার কোণে ৪ টি মিনার আছে। মসজিদের দেয়াল ৭ ফুট প্রশস্ত। মসজিদের ভিতরে ৪ টি স্তম্ভ বা থাম আছে। পূর্ব দিকে ৫ টি এবং উত্তর ও দক্ষিণে ২ টি করে মোট ৯ টি দরজা আছে। মসজিদ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক মেরামত ও সংস্কার করা হয়েছে কিছুদিন পূর্বে। সম্মুখ দ্বারসহ উত্তর-দক্ষিনের দেয়ালে দুটি করে পাঁচটি প্রবেশ দ্বার রয়েছে। কিবলা প্রাচীরের পাঁচটি অবতলাকৃতি মিহরাব রয়েছে যা পূর্ব দিকের খিলান পথ বরাবর। মিররাবগুলো কুইঞ্চের সাহায্যে নির্মিত। উত্তর ও দক্ষিণ দিকে কৌনিক খিলানপথ রয়েছে। ছাদে সর্ব মোট দশটি গম্বুজ থাকায় ধারণা করা হয় এটি সুলতানী আমলের আয়তাকার দশগম্বুজ টাইপের অন্তর্গত একটি মসজিদ। ড. আহমদ দীনার মতে চিরাচরিত নকশায় অলঙ্করণের সৌন্দর্য্য এটিকে হোসেনশাহী আমলের ইমারত বলে প্রমাণিত করে। এর প্রধান ফটকের উপরে দুটি পাথরের শিলালিপি রয়েছে। ভিতরে এ রকম আরও দুটি শিলালিপি দেখতে পাওয়া যায়। যেগুলো অস্পষ্ট।   যেহেতু মসজিদটি ঢাকা হতে দক্ষিন বঙ্গের হাইওয়ের রাস্তা সংলগ্ন সেহেতু মসজিদটি সহ উক্ত দীঘিটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে ঘোষনা করে উন্নয়ন করলে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন ( শ্রী শ্রী জগদ্বন্ধু সুন্দরের আশ্রম)
3
শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন ( শ্রী শ্রী জগদ্বন্ধু সুন্দরের আশ্রম)

শ্রী অঙ্গন, গোয়ালচামট, ফরিদপুর সদর, ফরিদপুর

মহাবতারী শ্রী শ্রী প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের আবির্ভাব ২৮শে এপ্রিল ১৮৭১ বাংলা ১২৭৮ সনের ১৬ বৈশাখ রোজ শুক্রবার। মানবলীলা সংবরণ করেন ১৭ সেন্টেম্বর ১৯২১। পৈত্রিক নিবাস ফরিদপুর শহর সংলগ্ন গ্রাম গোবিন্দপুর। পিতা-শ্রী দীননাথ ন্যায়রত্ম, মাতা-শ্রীমতী বামাসুন্দরী দেবী। শ্রী শ্রী প্রভু সুন্দরের আবির্ভাব মুর্শিদাবাদ জেলার ডাহাপাড়ায়। কারণ ডাহাপাড়া পিতার কর্মস্থল ছিল। তিনি শ্রীধাম শ্রীঅঙ্গন প্রতিষ্ঠা করেন বাংলা আষাঢ় ১৩০৬ বঙ্গাব্দ রথযাত্রা উৎসবে। শ্রীঅঙ্গনের এ জমি দান করেন ফরিদপুর গোয়ালচামটের শ্রীরামসুন্দর ও শ্রীরাম কুমারমুদি। শ্রীরাম শ্রীঅঙ্গন মহানাম প্রচারের কেন্দ্রে পরিনত হয়। মানবলীলা সংবরণের পরবর্তী মাস বাংলা ১৩২৮ সনের ২ রা কার্তিক হতে শ্রীধাম অঙ্গনে দিবস-রজনী অখন্ড মহানাম কীর্তন অব্যাহত রয়েছে। গোয়ালচামট শ্রী অঙ্গনে ২৪ প্রহর ব্যাপী নাম কীর্তন হয়। প্রতিবছর সপ্তাহব্যাপী নাম কীর্তনসহ জন্মোসব পালিত হয়। 

মথুরাপুর দেউল, মধুখালী
3
মথুরাপুর দেউল, মধুখালী

গাজনা, মধুখালী উপজেলা, ফরিদপুর

ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলায় অবস্থিত ফরিদপুর চিনিকলের কয়েকশ গজ উত্তরে মথুরাপুর গ্রামে কালের নীরব স্বাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে আছে শত শত বছরের আগের স্থাপত্য শিল্প মথুরাপুর দেউল। মধুরাপুর দেউল ষোড়শ শতাব্দীর একটি স্থাপনা। এর গঠনপ্রকৃতি অনুসারে একে মন্দির বললে ভুল হবে না। এটি একটি রেখা প্রকৃতির দেউল। মথুরাপুর দেউলটি ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজেলার গাজনা ইউনিয়নে অবস্থিত। কথিত আছে সংগ্রাম সিং নামক বাংলার এক সেনাপতি এটি নির্মাণ করেছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ১৬৩৬ সালে ভূষণার বিখ্যাত জমিদার সত্রজিতের মৃত্যুর পর সংগ্রাম সিংহকে এলাকার রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং তৎকালীন শাসকের ছত্রছায়ায় তিনি বেশ ক্ষমতাবান হয়ে উঠেন। এলাকার রীত অনুসারে তিনি কপান্তি গ্রামের এক বৈদ্য পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেন এবং মধুরাপুরে বসবাস করতে শুরু করেন। অন্য এক সূত্রমতে সম্রাট আকবরের বিখ্যাত সেনাপতি মানসিং রাজা প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ের স্মারক হিসাবে এই দেউল নির্মাণ করেছিলেন। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের মধুখালী বাজার থেকে মধুখালী-রাজবাড়ী ফিডার সড়কের ঠিক দেড় কিলোমিটার উত্তরে দেউলটির অবস্থান। দেউলটির পশ্চিমে রয়েছে চন্দনা নদী। দেউলটি প্রায় ৯০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট এবং কারুকাজ খচিত। এই দেউলটির গায়ে রয়েছে টেরাকোটার দৃষ্টিনন্দন ও শেল্পিক কাজ। দেউলটির শরীর জুড়ে রয়েছে শিলা খন্ডের ছাপচিত্র। রয়েছে মাটির ফলকের তৈরী অসংখ্য ছোট ছোট মুর্তি-যা দশীনার্থীদের কাছে আকর্ষনীয়, দেউলটির গায়ে সেঁটে দেওয়া ছোট ছোট মুর্তির মধ্যে রয়েছে বিবস্ত্র, নর-নারী, নৃত্যরত নগ্ননর-নারী, তীর ধনুক হাতে হনুমান, পেঁচা, জাতীয় পাখি, মস্তকবিহীন মানুষের প্রতিকৃতি, দ্রুত গামী ঘোড়া ইত্যাদি। বাংলার ইতিহাসে এর নির্মাণশৈলী অনন্য বৈশিষ্ট বহন করে। এটি প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একটি সম্পদ।

সাতৈর মসজিদ, বোয়ালমারী
3
সাতৈর মসজিদ, বোয়ালমারী

সাতৈর, বোয়ালমারী উপজেলা, ফরিদপুর

বাংলার নবাবদের স্থাপত্য শিল্পের একটি অনন্য নিদর্শন হলো সাতৈরের ঐতিহাসিক ৯ গম্বুজ বিশিষ্ট সাতৈর মসজিদ যা কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর দৈর্ঘ্য ৬২ ফুট, প্রস্থ ৬২ ফুট, উচ্চতা এখনও সমতল ভূমি হতে ৩০ ফুট। ওয়ালের গাঁথুনি ৫.৫ ফুট। মাটির নীচে অদৃশ্য অবস্থায় আছে ১০ ফুট। আশ্চর্যজনক ঘটনা হচ্ছে এই মসজিদে কোন লোহা বা কাঠের বর্গা বা ভীম নেই। সম্পূর্ন শূন্যের উপর ছাদ বা গম্বুজ কয়টি আজও অক্ষত অবস্থায় আছে। ফরিদপুর জেলার অধীন বোয়ালমারী থানার সাতৈর নামক স্থানে এই ঐতিহাসিক সাতৈর মসজিদ অবস্থিত। সাতৈর শাহী মসজিদের পাশ ঘেঁষেই রয়েছে ঐতিহাসিক গ্রান্ড ট্রাংক রোড বা শের শাহ সড়ক। কেউ কেউ মনে করেন সাতৈর শাহ মসজিদ শের শাহের আমলের কীর্তি। মসজিদটি সম্পর্কে অনেক কাহিনী এলাকায় প্রচলিত আছে। `শাহ-হে-তুর` একটি ফারসী শব্দ। এর অর্থ অলীর পাহাড়। তাই শাহ-হে-তুর শব্দ থেকে এই গ্রামের নাম করণ করা হয়েছে সাতৈর। আনুমানিক সাতশত বছর পূর্বে এই গ্রামে বহু আউলিয়া দরবেশের বসবাস ছিল। মোঘল আমলে দিল্লীর বাদশাহ ছিলেন আলাউদ্দিন হুসাইন শাহ। আনুমানিক ১৫১৯ থেকে ১৫৩২ সালের মধ্যে সুলতান হুসাইন শাহের সুযোগ্য পুত্র নসরত শাহ এর সময় মসজিদটি তৈরী হয়েছিলো । সাতৈর গ্রামে বহু পীর আউলিয়া দরবেশের বসবাস ছিল। তার অনেক নির্দশন এখনও বিদ্যমান আছে। এসব পীর আউলিয়াগণ যথাক্রমে বাগদাদ ও ইয়েমেন হতে ধর্ম প্রচারের জন্য এখানে আগমন করে বলে অনেকের ধারনা। সাতৈর মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে সাতৈর শব্দ থেকে। ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে সাতৈর স্থানটি বিখ্যাত দরবেশ শাহ সাইয়ীদ মাসুদ হককানী যিনি আলাউদ্দিন শাহের ধর্ম নির্দেশক ছিলেন। এই পথ প্রদর্শক দরবেশ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন এবং তাঁর সম্মানে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। সময়ের পরিক্রমায় মসজিদটি ব্যবহৃত অবস্থা থেকে একটি জঙ্গলের ডিবিতে পরিনত হয়েছিলো। আট বছর পরে জঙ্গল পরিস্কার করে প্রশাসনিক ভাবে ইহার সংস্করণ ও মেরামত কাজ সম্পাদন করা হয়। স্থানীয় মতে মসজিদে একটি উৎকীর্ণ পাথর খন্ড ছিল। তবে ইহা মীরগঞ্জের প্রধান বহু আগে এনেছিলেন। আবার বলা হয় যে এটা ছিলো সাতৈর গ্রামের মুফতি সাহেবের। যার নাম ছিল খন্দকার আলী নকবী। তিনি ছিলেন রাজ দরবারের বিচারক। তবে উল্লেখ্য ব্যক্তিবর্গের নিশ্চিত কোন ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায় না। মসজিদটি ০৯ (নয়) গম্বুজ বিশিষ্ট যা ভাটিয়াপাড়া মধুখালী রেললাইনের উপর ঘোষপুরের উত্তর পূর্বে সাতৈর বাজারের পূর্ব পাশে অবস্থিত। আয়তাকার ভূমি নকশায় ভিতরের পরিমাপ ১৩.৮০ বর্গ মিটার এবং এটি নয়টি গম্বুজ দ্বারা আবৃত। চারটি পাথরের স্তম্ভের উপর গম্বুজটি উদীয়মান এবং চারদিকে আরো বারোটি স্তম্ভ রয়েছে। তবে স্থাপত্যরীতি ও অলঙ্করনের দিক থেকে গম্বুজটি তাৎপর্যপূর্ন। কারণ এটি বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের পিলার ও নির্মাণ অলঙ্করনে একইরুপ। বাইরের চার কোণায় চারটি বুরুজ রয়েছে। পাথর দ্বারা স্তম্ভগুলো যুক্ত রয়েছে। গম্বুজ খিলানগুলোতে এখনো কিছুটা সাদা রঙের আবছা আবৃত । পশ্চিম দিকের মিহরাবগুলোর ভিতরের প্রধান মিহারাবের দেয়ালে তিনটি নকশাকার অলংকরণে খিলান রয়েছে। মধ্যবর্তী মিহরাবটি বড়। পূর্ব দিকে তিনটি খিলানপথ দিয়ে অভ্যন্তরে প্রবেশ করা যায়। এছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ দিকে তিনটি খিলান পথ রয়েছে। তবে বর্তমানে উত্তর ও দক্ষিনের প্রবেশ দ্বারগুলো জানালা হিসেবে রুপান্তরিত করা হয়েছে। বর্গাকার এই মসজিদটির মেঝে ঢালু হয়ে গেছে ৭৬ মিটার। দেখতে মনে হয় প্রবেশ পথগুলো ক্রমশ সরু হয়ে গেছে অর্থাৎ চোখের অসংগতিতে যে রকম দেখায়। ভেতরে এবং বাইরে সিমেন্ট প্লাস্টারে মেরামত করা হয়েছে। বাইরের দেয়ালেও সিমেন্ট প্লাস্টারে লাল রঙের মসৃণ আবরণ দেয়া হয়েছে। হাল আমলে সংস্কারের ফলে মসজিদটিকে আধুনিক মনে হলেও এটি বহু প্রাচীন আমলের একটি প্রত্ন সম্পদ এবং জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ। মসজিদের বিভিন্ন সংযোজন বা রুপান্তর করে মেরামত করা হলেও এর ভিতর ও বাইরের অধিকাংশ মূল আদল এখনও নষ্ট হয়নি।

কানাইপুর শিকদার বাড়ী
5
কানাইপুর শিকদার বাড়ী

শিকদার বাড়ী, কানাইপুর, ফরিদপুর সদর উপজেলা, ফরিদপুর

ফরিদপুর শহর থেকে প্রায় ৬ কিঃমিঃ পরে দক্ষিণ পশ্চিমে এবং কানাইপুর বাজার থেকে উত্তরে ফরিদপুর-যশোর মহাসড়কের কাছে কানাইপুর গ্রামের পূর্বমূখী একটি পুরাতন বাড়ি রয়েছে। স্থানীয় ভাবে এটি শিকদার বাড়ি নামে পরিচিত। এ বাড়িটি কুমার নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত। এ বাড়িটির পূর্বপাশ দিয়ে গ্রামের একটি মেঠোপথ চলে গেছে। এ বাড়িটির দুটি অংশ রয়েছে । একটি বাইরের ও আরেকটি ভিতরের অংশ। ভবনটির পূর্ব দিকের বারান্দার মাঝখানে একটি প্রবেশ পথ রয়েছে। এই প্রবেশপথ দিয়ে দিয়ে সহজেই ভবনের বাইরে ও ভেতরের আঙিনায় ঢুকতে পারা যায়। অন্যদিকে ভিতরের আঙিনায় ঢোকার জন্য দুটি প্রবেশ পথ রয়েছে। তবে পূর্ব পাশের পথটির ছাদ থাকলেও পশ্চিম পাশের পথটি উপরে খোলা। প্রসাদটির অভ্যন্তরে একটি দ্বিতল আবাসিক ভবন রয়েছে। ভবন সংলগ্ন চারপাশে খোলা বারান্দা আছে। ফরিদপুরের জমিদার শাসনের ইতিহাস বেশ সমদ্ধ, এখানকার খ্যাতনামা জমিদার বংশ গুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল কানাইপুরের ‘শিকদার বংশ’। এদেরই বাসস্থানের ধবংসাবশেষ আজ আমরা দেখতে পাই ‘শিকদার বাড়ি’ হিসেবে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদৌলার শাসনামলেরও প্রায় শতবছর পূর্বে এই জমিদার শিকদার বাড়ী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন থেকে জানা যায়। জমিদার হিসেবে শিকদার বংশের উন্নতি শুরু হয় ভবতারিনী শিকদারের আমল থেকে। বিধবা রানী ভবতারিনী তার একমাত্র সন্তান সতীশ চন্দ্র শিকদার এবং অপর এক বিপত্নিক কর্মচারীর সহায্যে তার জমিদারি পরিচালনা করতেন। তবে ভবতারিনীর এই একমাত্র পুত্র সুশাসকের চাইতে উদ্ধত, অহংকারী এবং কুটনৈতিক হিসেবে বেশি পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীকালে সতীশ চন্দ্র শিকদারের দুই পুত্র সুরেন্দ্র নাথ শিকদার এবং নিরদবরন শিকদারের মধ্যে জমিদারি ভাগাভাগি হয়ে যায় এবং সুরেন্দ্র নাথ বড় সন্তান হিসেবে জমিদারীর সিংহভাগ মালিকানা লাভ করে। সুরেন্দ্র নাথের অকাল মত্যুর পরে তার স্ত্রী রাধা রানি শিকদার জমিদারি পরিচালনা করা শুরু করেন। রাধা রানী শিকদারের মত্যুর পর পুত্রদের কোলকাতায় অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক ভাঙ্গনের কারণে এক সময়ে এই জমিদারি তৎকালীণ সরকার বাজেয়াপ্ত করে নেয়। বর্তমানে এটি অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে। যদি এটিকে ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্বিক একটি নিদর্শন হিসাবে সরকারিভাবে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলা যেত তবে সরকার যেমন একদিকে আথিক লাভবান হবে তেমনি দর্শনার্থীরাও এটিকে একটি ঐতিহাসিক বিনোদন কেন্দ্র হিসাবে দেখতে পেত। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলে দৃষ্টি আকর্ষন করছি।

বাইশরশি জমিদার বাড়ী, সদরপুর
3
বাইশরশি জমিদার বাড়ী, সদরপুর

বাইশরশি, সদরপুর উপজেলা, ফরিদপুর

ষোল দশকের শেষের দিকে ভারত থেকে ব্যবসা করতে ফরিদপুরের সদরপুরে আসেন বাবু সুকুমার সাহা। ১৭ শতকের শুরুর দিকে ব্যবসা-বানিজ্যের কারনে এখানে গড়ে তোলেন তার বিশাল জমিদারী। জমিদারদের প্রধান আয়ের উৎস ছিল ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা। খাজনা বা কর আদায় করার জন্য নায়েব নিযুক্ত করা হতো। অবাধ্য প্রজাকে শায়েস্তা করার জন্য লাঠিয়াল বাহিনী ব্যবহার করা হতো। অপরাধ অনুসারে এই প্রজাদের অত্যাচার করা হতো। অত্যাচারের ফলে কারও মৃত্যু হলে মৃতদেহ বাড়ির পেছনে গভীর অন্ধকূপে নিক্ষেপ করা হতো। বাবুদের বাড়ির সামনে দিয়ে জুতা পায়ে, ছাতা মাথায় দিয়ে যাতায়াত নিষেধ ছিল। বাবুদের চারটি পুকুরের মধ্যে নাট মন্দিরের সামনের পুকুরটি পানীয় জলের জন্য রক্ষিত ছিল। ওই পুকুরে কেউ পা ভেজাতে পর্যন্ত পরত না। বেচু নামে এক মুসলমান প্রজা অজ্ঞতাবশত ওই পুকুরে পা ধোয়ার অপরাধে তাকে বেদম প্রহার ও গোপ-দাড়ি তুলে ফেলা হয়। আর তা নিয়ে মামলা হলেও বাবুদের মাত্র এক পাই জরিমানা হয়। মনিক দহের বড় মিয়া আবদুল বাবুদের বশ্যতা স্বীকার না করার জন্য বাবুরা তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। বড় মিয়া আবদুল উপায়ন্তর না দেখে শিবসুন্দরী চৌধুরানীকে মা ডাকেন। পরে শিবসুন্দরী চৌধুরানীর হস্তক্ষেপে বড় মিয়া আবদুলকে মামলা হতে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বাইশরশি শিবসুন্দরী একাডেমীর বর্তমান খেলার মাঠ বাবুদের চিত্তবিনোদনের জন্য বাগানবাড়ি ছিল। তারা ওই বাগানবাড়িতে খেয়াল-খুশি মত আনন্দ-ফুর্তি করত। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি ও প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন হওয়ার পর রমেশবাবু অর্থ এবং বিত্তহীন হয়ে পড়লে জমিদারি হারিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসায় লোকসান ও বাড়ির দাসী কর্তৃক সঞ্চিত স্বর্ণখণ্ডাদী চুরি হওয়ায় রমেশবাবু নিজে বন্দুকের গুলিতে আত্মহত্যা করেন। এরপর জমিদার পরিবারের সদস্যরা কলকাতা চলে যান এবং অমরেশ বাবু দিনাজপুর চলে যান। এভাবেই বাইশরশি জমিদারদের জমিদারির বিলুপ্তি ঘটে।